বিঙ্গানী জগদীশচন্দ্র বসুর সাহিত্য-ভাবনা
(১৫০ তম জন্মবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে নিবেদিত)
ড. পরিমল ঘোয, প্রাক্তন রিডার, বাংলা বিভাগ,
উনিশ শতকে বাংলার নব-জাগরণের সূচনা ঘটেছে । এখানে ঙ্গানে-বিঙ্গানে, সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে, চিন্তনে-মননে নতুন দিগন্ত ঊন্মোচিত হয়েছে । এ ক্ষেত্রে রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র প্রমুখ কৃতী সন্তানদের ভূমিকা অবশ্যই স্মরণযোগ্য । জগদীশচন্দ্র বসু হলেন বাংলাদেশে বিঙ্গান-সাধনার এক পুরোধা পুরূষ । ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহন করেন । তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার রাড়িখাল গ্রামে । তাঁর পিতা ভগবানচনদ্র বসু ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন । বাল্যকালে ফরিদপুর জেলার গ্রাম্য পাঠশালায় জগদীশচন্দ্রের পড়াশুনা শুরু হয় । পরে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন । এর পরই ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিলাত গমন করেন এবং চিকিৎসা-বিদ্যা অধ্যয়ন করতে থাকেন । কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য তাঁর শিক্ষায় বাধা পড়ে । তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যায় ট্রাইপোস পান।পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যলয় থেকে ডি. এস. সি. ডিগ্রি লাভ করে স্বদেশে ফেরেন ।
এদেশে ফিরে জগদীশচন্দ্র ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন।এঋানে ভারতীয় ও ইউরোপীয় অধ্যাপকদের মধ্যে বেতন-বৈষম্য সৃষ্টি করা হয় এবং তার প্রতিবাদে তিনি তিন বছর কলেজ থেকে বেতন গ্রহন করেননি।পরে অবশ্য কলেজ কতৃর্পক্ষ নতি-স্বীকারে বাধ্য হন।অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিঙ্গানের নানা বিযয়ে গবেযণার কাজ চলিয়ে যেতে থাকেন।বিঙ্গানের গবেযনার বিযয়ে জগদীশচন্দ্র উজ্বল পরিচয়কে সাধারণ ভাবে তিন পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে।
১)বিদু্যৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং বিনা তারে বার্তা প্রেরণ সম্পর্কে গবেযণা।
২) জৈব ও অজৈব পদার্থে উত্তেজনার ফলে সাড়া দেওয়ার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষণা।
৩)উদ্ভিদ ও প্রাণীর পেশির মধ্যে তুলনামূলক শারীরবিদ্যে বিযয়ক গবেষণা ।
১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের অবসর গ্রহনের পর ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের তিনি বসু বিঙ্গান মন্দির প্রতিষ্টা করেন। তাঁর উপাজর্নের বড়ো অংশ ব্যয় করে তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এদেশে বিঙ্গান গবেষণার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্টানটির ভূমিকা সুবিদিত। বিঙ্গান বিযয়ক গবেযণার জন্য তিনি দেশ-বিদেশে বহূ সম্মানে ভুষিত হয়েছেন। জগদীশচন্দ্র বিশিষ্ট বিঙ্গানী হিসাবে জগদ্বিখ্যাত। অামাদের এখানে অালোচ্য বিযয় হলো-বাংলা সাহিত্যের প্রতি জগদীশচন্দ্রের অনুরাগ এবং তাঁর সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় দান করা। জগদীশচন্দ্রের সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের একটা বড়ো প্রমান দিয়ে অালোচনা শুরু করা যেতে পারে। তাঁর বিঙ্গান বিষয়ক গবেষণা-পত্র রয়্যাল সোসাইটিতে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের। এর পর অবশ্য বেশ ক'টি গবেষনাপত্র এখানে প্রকাশিত হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তার অাগেই ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের বাংলায় লেখা তাঁর একটি বিঙ্গানভিত্তিক প্রবন্ধ 'ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে' 'দাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।এর পর তিনি প্রতি বছরই দু-একটি করে প্রবন্ধ বাংলায় লিখেছেন এবং কোনো না কোনো পত্রকায় প্রকাশিত হয়েছে।
সাহিত্যের প্রতি তাঁর অাগ্রহের অার একটি বিশেষ প্রমান পাওয়া যায়। হেমেন্দ্র নাথ বসু প্রবতির্ত 'কুন্তলীন পুরস্কার' বাংলা সাহিত্যে বিশেষ সম্মানের ব্যাপার ছিল।বিঙ্গানসাধক জগদীশঢন্দ্র ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রতিযোগিতায় 'নিরুদ্দেশের কাহিনি' নামে বিঙ্গানভিত্তিক একটি গল্প পাঠান।তিনি নিজের নাম গোপন রেখে বোনের নামে এটি পাঠান।বলা বাহুল্য, যথাসময়ে গল্পটি পুরস্কৃত হলে তিনি পঙ্চাশ টাকা দক্ষিণা পান এবং সাহিত্য মহলে পরিচিত হন। একজন বিঙ্গানসেবীর পক্ষে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ তাঁর সাহিত্য প্রীতিকেই তুলে ধরে।
গুণীজন গুণীজনকে ঠিকমতো চিনে নেন।জগদীশচন্দ্রের ক্ষেত্রেও সেরূপ ঘটনা ঘটেছিল।সমকালীন কিছু বিঙ্গানসাধকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে উঠেছিল।কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল তাঁর এক গভীর সম্পর্ক ।রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব জগদীশচন্দ্রকে সহিত্য-রচনায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে উভয়ের চিঠিপত্রের মাধ্যমে জানা যায়, উভয়ের মধ্যে বিঙ্গান জিঞ্জাসা ও সাহিত্যপ্রীতি ছিল, যদিও তাতে কিছু তারতম্য ছিল। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। জগদীশচন্দ্র তখন জীব ও জড় বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন। জড়ের পরিবর্তনশীলতা বিষয়ে তিনি নানা তথ্য প্রমান দিয়ে চলেছনে । রবীন্দ্রনাথ সে-খবর অনেকখানি জানতেন । জগদীশচন্দ্র তখন বিদেশে ছিলেন । জগদীশচন্দ্রের উদ্ভাবিত বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ 'বঙ্গদশর্ন' প্রতিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন 'জড় কি সজীব?' এই নামে । এই খবর জানতে পরে জগদীশচন্দ্র লন্ডন থেকে একটি পত্রে (২৫-৭-১৯০১ খ্রিঃ) রবীন্দ্রনাথকে লেখেনঃ 'তুমি যে গত মাসে অামার কাযের্র অাভাস বঙ্গদর্শনে লিখিয়াছিলে, তাহা অতি সুন্দর হইয়াছে। জগদীশচন্দ্র সাহিত্য রসঙ্গ ব্যক্তি ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়তেন। এগুলি বিদেশে প্রাচার হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করতেন এবং উৎসাহী ও ছিলেন । একটি চিঠিতে তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা জানিয়ে লেখেনঃ তোমার গল্পগুলি অামি এদেশে প্রকাশ করিব। লোকে তাহা হইলে কতক বুঝিতে পারিবে।'
জগদীশচন্দ্রের সাহিত্যানুরাগের পরিচয় জানা গেল।এবার তাঁর রচনাদির কিছু খবর নেওয়া প্রয়োজন। তিনি ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে থেকে পর পর অনেকগুলি প্রবন্ধ লিখেছেন নানা পত্রিকায়।এই পত্রিকাগুলির মধ্যে 'প্রবাসী' 'মুলুক', 'সঞ্জীবনী', 'ভারতবর্ষ', 'সাহিত্য', 'মোসলেম ভারত' প্রভূতি উল্লেযোগ্য। তাঁর রচনা নিয়ে তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
(১) অব্যক্তঃ নানা পত্রিকায় প্রকাশিত বিঙ্গান ও অন্যান্য বিষয় কুড়িটি রচনা এতে স্হান পেয়েছে। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রকাশিত হয়।
(২) প্রবন্ধাবলিঃ পত্রিকায় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রবন্দ্ধ গুলি এখানে সংকলিত হয়েছে । এটি ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
(৩) পত্রাবলীঃ বিভিন্ন গুনীজনদের উদ্দেশে লেখা জগদীশচন্দ্রের চিঠিগুলি একত্রিত করে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়।
'অবক্ত' গ্রন্হটির নামকরন খুবিই তাৎপযর্বহ।এ জগতের অনেক কিছুই সাধারণভাবে অামাদের কাছে অব্যক্ত । অালো, শব্দ, উদ্ভিদ প্রভিতি বৈশিষ্ট্য অামাদের কাছে অব্যক্ত এই অব্যক্তকে ব্যক্ত করাই ও গ্রন্হের উদ্দেশ্য। গ্রনথটি প্রকাশিত হলে (নভেম্বর, ১৯২১) জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে গ্রন্হটি পাঠিয়ে লেখেন 'সুখে দুঃখে কত বছরের স্মৃতি তোমার সহিত জড়িত । অনেক সময় সে সব কথা মনে পড়ে। অাজ জোনাকির অালো রবির প্রখর অালোর নিকট পাঠাইলাম' । রবীন্দ্রনাথ বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে উত্তরে (২৪-১২-১৯২১) লিখেছিলেনঃতোমার 'অব্যক্ত'-র অনেক লেখাই অামার পূর্ব পরিচিত এবং সেগুলি পড়িয়া অনেকবারই ভাবিয়াছি।যদিও বিঙ্গানবানীকেই তুমি তোমার সুয়োরাণী করিয়াছ, তবু সাহিত্য-সরস্বতী সে পদের দাবি করিতে পারিত-কেবল তোমার অনবধানেই সে অনাদূত হইয়া অাছে' । রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য শুধু 'অব্যক্ত'র ক্ষেত্তে নয়, পরবর্ত্তী গ্রন্হ 'প্রবন্ধাবলী'র রচনাগুলি সম্বন্ধে ও প্রযোজ্য।
এবার জগদীশচন্দ্রের রচনাদির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কের কিছু বলা যেতে পারে।ভারতবর্ষে বিঙ্গান-সাধনার প্রথম যুগে বাংলা ভাষায় লেখা এই সব রচনায় জগদীশচন্দ্রের স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটেছে।বাংলা ভাযায় বিঙ্গান চর্চা এবং তার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের সমন্বয় ঘটানো।বাংলা ভাযায় বিঙ্গান চর্চা এবং তার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের সমন্বয় ঘটানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল।বিঙ্গানের জটিল ও গূঢ় বিষয়কে তিনি অত্যন্ত সহজ সরল ভঙ্গিতে বাংলা ভাষায় বিশ্লেযণ করেছেন এবং তা সাধারন পাঠকের কাছে খুবই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।এ ক্ষেত্তে পরিচিত ও বাস্তব ক্ষেত্তে থেকে উদাহরণ নিয়ে তিনি সত্যটিকে প্রতিষ্টা করেছেন। বিঙ্গান-বিযয়ক প্রবন্ধ ছাড়াও দেশ,জাতি ও সমাজের অগ্রগতির ভাবনা তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।এ বিযয়ে ও তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ রচনা করেছেন।বলার কথা,গভীর উপলব্ধি এবং ভাযা-ভঙ্গিমার গুনে তাঁর রচনাগুলি সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে।সাহিত্যের দরবারে তা স্হান করে নিয়েছে।
জগদীশচন্দ্রের রচনাগুলিকে বৈশিষ্ট্য অনুসারে কতগুলি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
ক)গল্প-যায় সঙ্গে বিঙ্গানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
খ)বিঙ্গানভিত্তিক গল্প।
গ)প্রাচীন শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক রচনা।
ঘ)বৈঙ্গানিক তত্ত্বমূলক প্রবন্ধ।
ঙ)উদ্ভিদ সম্পর্কীয় প্রবন্ধ।
চ)অভিভাষণ বা বক্তৃতা।
ছ)মানসিক প্রতিক্রিয়াজাত রচনা।
এবার এই ভাগগুলির বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু অালোকপাত করা যেতে পারে।
ক-গল্প-যায় সঙ্গে বিঙ্গানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই
'অগ্নিপরীক্ষা' ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লেখা একটি গল্প।ইংরেজ সেনাদের নেপাল অাক্রমণের বিরুদ্ধে তরুণদলের বীরুত্বপূর্ণ সংগ্রামে অাত্ম বলিদানের কাহিনী এখানে বিবৃত হয়েছে । এখানে বীরত্ব ও মূল্যবোধকে প্রতিষ্টিত করা হয়েছে। 'রাণী সন্দশর্ন' গল্পে দেখা যায়, রাস্তার পাশে এক দুঃস্হ ও অসুস্হ তরুণকে অবঙ্গা করে সভ্য-ভব্য মানুষরা চলে যাচ্ছে।কিন্তু এক ভিখিরি-মা তার ভিক্ষার সামান্য অথর্টুকু তাকেই দান করে চলে গেল।এখানে মানবিকতা ও মহত্ত্ব উজ্জ্বল ভাবে ফুটে উঠেছে।
খ-বিঙ্গান ভিত্তিক গল্প
'পলাতক তুফান' গল্পটি কুন্ডলীন পুরস্কার প্রাপ্ত 'নিরুদেশের-কাহিনি' গল্পটির পরিবর্তিত রূপ।সমূদ্রে ঝড় ওঠায় উত্তল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে । যাত্রীদের মানসিক বিপযর্য়ের সময় সমূদ্রে তেল ঢেলে জলের চান্ঞল্য থামানো এবং কূলে ভিড়বার কথা বলা হয়েছে।
গ-প্রাচীন শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক রচনা
'যুক্তকর' প্রবন্ধটিতে প্রাচীন ভারতে সৃষ্ট অজন্তার গুহাচিত্র দেখে লেখক জগদীশচন্দ্রের বিষ্ময় ও অনুভব কাব্যিক ভাবায় প্রকাশিত হয়েছে।বিঙ্গানীর হাতে লেখা এ রচনা ভাবনার খোরাক জোগায়।
ঘ-বৈঙ্গানিক তত্ত্বমূলক প্রবন্ধ
'ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে' প্রবন্ধটিতে গল্পচ্ছলে তত্তের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার প্রয়াস রয়েছে।প্রবন্ধের অারম্ভেই যেন মনে হয়।লেখক গল্প বলছেন "অামাদের বাড়ির নিম্নেই গঙ্গা প্রবাহিত।নদীকে জিঙ্গাসা করিতাম, তুমি কোথা হইতে অাসিতেছ?" নদী উত্তর করিত, মহাদেবের জটা হইতে।" ...গঙ্গার উৎপত্তিস্হলের সন্ধান করতে গিয়ে লেখক ভৌগোলিক, বৈঙ্গানিক ও পৌরানিক ভাবনার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছন । 'অদৃশ্য অালোক' প্রবন্দ্ধে লেখন দেখার 'সত্য' ও না-দেখার 'অস্তিত্ব' সম্পর্কে গল্প করতে করতে দৃশ্য অদৃশ্যের ভেদাভেদ, রূপান্তর ও তত্ত্বের মধ্যে পাঠকদের টেনে এনেছন।'মন্দ্রের সাধন' প্রবন্ধে লেখক পাঠক মনকে অাকষর্ণ করতে গিয়ে বলেছেন-লোহা ও তামার তার দিয়ে মরা ব্যাঙকে   স্পর্শ করলে নেচে ওঠে।তারপর গ্যালভানির প্রসঙ্গ করে, তত্তের মধ্যে চলে গেলেন।'অাকাশ স্পন্দন ও অাকাশসম্ভব জগৎ' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন-সেতারে অাঙুল চালালে শব্দ ওঠে।হাওয়ার প্রতিকূলে বাধা সৃষ্টি করলে শব্দ ওঠে। ক্রমে তিনি অাকাশ স্পন্ধনের রহস্যের সন্ধানে পাঠকদের নিয়ে গেলেন।
ঙ-উদ্ভিদ সম্পর্কীয় প্রবন্ধ
জগদীশচন্দ্রের উদ্ভিদ বিষয়ক প্রবন্ধগুলি প্রথম থেকেই পাঠকদের মনো্যোগ অাকযর্ণ করে।তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধে বলেছেন গাছ অামাদের নিকটতম প্রতিবেশী।গাছ খায়, ঘুমায় ,অানন্দে ও দুঃখে অনুভূতি প্রকাশ করে থাকে।গাছের অাহার ব্যবহার নিয়েও তিনি চমকপ্রদ কথা বলেছেন।হাতের তুড়িতে বনচাঁডাল গাছের পাতা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। লাজুক শ্রেণীর গাছের স্বভাব তিনি বুঝিয়ে বলেছেন।স্নায়ুর স্পন্দনের নানা বৈশিষ্ট্য তিনি পরীক্ষা ও উদাহরণের সাহায্যে সহজ সরল ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন তাঁর এই শ্রেণির অালোচনামূলক প্রবন্ধগুলির মধ্যে 'গাছের কথা', 'উদ্ভিদের জম্ম ও মৃত্যু', 'নির্বাক জীবন', অাহত উদ্ভিদ','স্নায়ুতন্ত্রে উত্তেজনা প্রবাহ' প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
চ-অভিভাষণ বা বক্তৃতা পযর্ায়ে রচনা
এই জাতীয় রচনাগুলি ছাত্র-ছাত্রী বা ঙ্গানান্বেষী মানুযদের উদ্দেশ্যে রচিত।এখানে বিঙ্গানের কথা যেমন অাছে, তেমনি দেশ, জাতি ও সমাজ-প্রেক্ষিতে মানুযের কর্মপ্রেরণার প্রতি ইঙ্গিত দান হয়েছে।'নিবেদন' রচনাটি বসু বিঙ্গান মন্দির-এর প্রতিষ্টা দিবস (৩০ নভেম্বর,১৯১৭) উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণ।এখানে দেশের তরুণ সমাজকে বিঙ্গান-গবেযণায় অাত্মনিয়োগ করার জন্য অাহ্বান জানানো হয়েছে।'দীক্ষা' রচনাটিও বসু বিঙ্গান মন্দির-এর ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ।এ রচনায় তিনি বলেছেন, প্রত্যেকের মধ্যে শক্তি রয়েছে, সেই শক্তিকে যথোপযুক্ত কাজে ব্যাবহার করতে হবে।সংহত শক্তি নিয়ে মহত্তর কাজে এগিয়ে যাওয়াই হল ছাত্র সমাজের প্রধান উদ্দেশ্য।'নবীন ও প্রাচীন' রচনাটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর সভাপতি হিসাবে প্রদত্ত ভাষণ।সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচন নিয়ে প্রধান ও নবীনদের মধ্যে এক অস্বস্তিকর পরিস্তিতি সৃষ্টি হলে (১৯১৮) জগদীশচন্দ্র এই পদ গ্রহনে স্বীকৃত হন।এটা বিঙ্গান বিযয়ক কোনো ভাষণ নয়।তিনি তাঁর ভাষণে প্রবীনদের অভিঙ্গতা ও নবীনদের উৎসাহকে সমন্বিত করে সমাজ ও সংস্কৃতিমূলক করার কথা বলেছেন।'বোধন' রচনাটিও বিঙ্গান বহির্ভুত।বিক্রমপুর সম্মিলনে (১৯১৫) এটি সাধারন মানুযের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ।রচনাটিতে বাংলা তথা ভারতের অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবের কথা শুনিয়ে সকলকে দেশ গঠনে অাহ্বান জানানো হয়েছে।'বিঙ্গান সাহিত্য' রচনাটি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনীর ময়মনসিংহ অধিবেশনে (১৯১১) জগদীশচন্দ্র কর্তৃক সভাপতির ভাষণ।জগদীশচন্দ্রের ভাষণ শুনবার জন্য প্রচুর জন সমাগম ঘটে।কিন্তু হলে এত অাসন না থাকায় উদ্যোক্তারা টিকিট কেটে লোক ঢোকানোর কথা ভাবতে থাকেন।কিন্তু জগদীশচন্দ্র এই টিকিট ব্যবস্হার বিরোধিতা করেন। শেযে পর পর দুদিন তিনি একই বক্তৃতা দেন।দেশের উন্নয়নে বিঙ্গান ও সাহিত্যের ভূমিকা বিযয়ে এই ভাষণে অালোকপাত করা হয়েছে।
ছ-মাসিক প্রতিক্রিয়াজাত রচনা
এই পযর্য়ের রচনা গুলিতে লেখকের নানাবিধ অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে।'মনন ও করণ' রচনায় দেখা যায়,কয়েকটি বাংলা পত্রিকায় লেখকের কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।কিন্তু রবীন্দ্রনাথ,প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও অারো দু-চার জন ছাড়া অন্যরা তাঁর লেখা নিয়ে কোনো রকম অালোচনাই করেননি।এতে লেখক খুবই অভিমান ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন এই রচনায়।'হাজির' রচনায় শুরু ভাবনার সঙ্গে  অশুভ ভাবনার বিরোধের কথা বলা হয়েছে।নানা বাধা বিঘ্ন ও অসহযোগিতার মধ্য দিয়ে লেখক কীভাবে কাজ করে এগিয়ে গেছেন, তা জানিয়েছেন।কিন্তু বড়ো সাধনা সমবেত প্রয়াসেই সফল হতে পারে। তাঁর কথায়-একটি কোকিলের ডাকে বসন্ত অাসে না।
জগদীশচন্দ্র বিগত হয়েছেন ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে।বিগত পঙ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর একটি করে রচনা মাধ্যমিক শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়ে অাসছে। বতর্মান কাল পযর্ন্ত এটি তাঁর উজ্জ্বল উপস্হিতি হিসাবে গণ্য করা যায়।বিঙ্গানী জগদীশচন্দ্রের সাহিত্য-সাধনা বাংলা সাহিত্যে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।বিঙ্গান বিযয়কে অবলম্বন করে সাহিত্যের প্রকাশ হিসাবে তা স্বীকৃতি হয়েছে।সবর্শেষ জগদীশচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য দিযে শেয করতে চাই । রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'বিঙ্গান ও রসসাহিত্যের প্রকোষ্ট-সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন মহলে।কিন্তু তাদের মধ্যে যাওয়ার অাসার দেনা-পাওনার পথ অাছে।জগদীশচন্দ্র ছিলেন সেই পথের পথিক।সেই জন্য বিঙ্গানী ও কবির মিলনের উপকরনণ দুই মহল থেকে জুটত ।'